ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ (Secularism) - অধ্যাপক গোলাম আযম

ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ (Secularism)

ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের জন্মকথা (Origin of Secularism)

  • 'ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ' বাংলা অনুবাদ ইংরেজি শব্দ 'সেকিউলারিজম' (Secularism) থেকে।

  • এটি গত আড়াই শত বছর ধরে একটি আদর্শ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

  • কামাল পাশা তুরস্কে প্রথম এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।

  • পাকিস্তানের ইতিহাস ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস।

ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় (Introduction to Secularism)

  • ধর্মনিরপেক্ষতা হল ধর্মীয় বিশ্বাসকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সামাজিক জীবনের সব দিককে ধর্ম ও আল্লাহ্‌-রাসূলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা।

  • এর প্রধান লক্ষ্য হল সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মকে পরিহার করা।

  • এটি আল্লাহ্‌র অস্তিত্বকে সরাসরি অস্বীকার না করলেও আল্লাহ্‌র গুণাবলী সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা পোষণ করে।

  • ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মনে করে আল্লাহ্‌ শুধু বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জীবনে আল্লাহ্‌ বা রাসূলের প্রয়োজন নেই।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস (History of Modern Secularism)

  • যদিও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আধুনিক সৃষ্টি নয়, এটি একটি আধুনিক মতাদর্শ হিসাবে প্রচারিত হচ্ছে।

  • এই মতবাদের আধুনিক সংস্করণ প্রায় আড়াই শত বছর পূর্বে ইউরোপে প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

  • পনেরো শতাব্দীতে এর জন্ম এবং আঠারো শতাব্দীর প্রথমার্ধে এটি বিজয়ী মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তৎকালীন ইউরোপের অবস্থা (The State of Europe at That Time)

  • ইউরোপে তখন সবেমাত্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছে।

  • চৌদ্দ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয়রা জ্ঞানার্জনের জন্য আলহামরা, কর্ডোভা ও গ্রানাডায় যেত।

  • পনেরো শতাব্দীর আগে ইউরোপ অজ্ঞতার অন্ধকারে ছিল।

  • বারো শতাব্দীর পর মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ছেড়ে দিলে ইউরোপ নতুন জ্ঞান সাধনায় অগ্রসর হয়।

ধর্ম ও বিজ্ঞানের লড়াই (The Battle of Religion and Science)

  • ইউরোপে খ্রিস্টান যাজকদের শাসন ছিল, যারা ধর্মের নামে নিজেদের মতামত চাপিয়ে দিত।

  • পাদ্রীরা মানুষের কাছে ধর্মের নামে আনুগত্য দাবি করত এবং গায়ের জোরে তা আদায় করত।

  • গবেষকদের মতামত যখন পাদ্রীদের মতের বিরুদ্ধে গেল, তখন বিজ্ঞানীরা বাধার সম্মুখীন হলেন।

  • গ্যালিলিওর মতো বিজ্ঞানীরা চরম দণ্ড ভোগ করলেন।

  • ধর্মের নামে অত্যাচারের কারণে চিন্তাশীলদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়।

গীর্জা বনাম রাষ্ট্র (Church vs. State)

  • বিদ্রোহীরা পাদ্রীদের উৎখাত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে অগ্রসর হয়।

  • পাদ্রীরা ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মান্ধ জনতাকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

  • এই সংগ্রাম ‘গীর্জা বনাম রাষ্ট্রের’ লড়াই নামে পরিচিত, যা ষোল ও সতরো শতাব্দী পর্যন্ত চলেছিল।

আপোষ প্রস্তাব (Compromise Proposal)

  • মার্টিন লুথারের নেতৃত্বে আপোষ প্রস্তাব দেওয়া হয়।

  • প্রস্তাবটি ছিল ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং পার্থিব জীবনের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের উপর ন্যস্ত থাকবে।

  • উভয় পক্ষ এই প্রস্তাবে রাজি হয়।

  • পাদ্রীরা বুঝতে পারল শুধু ধর্মান্ধ জনতা দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না।

  • বিদ্রোহীরা মনে করল, পার্থিব জীবনে ধর্মের প্রাধান্য না থাকলে চার্চকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

চিন্তার বিষয় (Things to Consider)

  • যে দেশে ধর্মনিরপেক্ষতার সূচনা হয়, সেখানে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের প্রাধান্য ছিল।

  • ইউরোপ বস্তুগত জ্ঞান মুসলমানদের থেকে নিলেও ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করেনি।

  • খ্রিস্টান পাদ্রীদের কাছে আল্লাহর বিধান ছিল না; তারা গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

  • পাদ্রীদের মতামত ভ্রান্ত প্রমাণিত হওয়ায় তারা আধুনিক শিক্ষার বিরোধিতা করে।

  • বিজ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের সাথে ইসলামের কোন সংঘাত নেই।

  • বিজ্ঞান আল্লাহ ও রাসূলের কোন সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করতে পারেনি।

মুসলিম বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism in the Muslim World)

  • মুসলিম বিশ্বে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে ইসলামকে প্রগতি বিরোধী মনে করে।

  • ইসলাম সম্পর্কে অনেক মুসলিম চিন্তাবিদ অমুসলিমদের থেকেও কম জানেন।

  • ইসলামী মন-মগজ ও চরিত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্ব জীবনের সকল দিক থেকে উৎখাত হয়ে গেছে।

  • চিন্তার ক্ষেত্রে দাসত্বের কারণে মুসলিম নেতৃত্ব পঙ্গু হয়ে গেছে।

  • তারা ইউরোপের অন্ধ অনুসরণ করে চলছে।

  • মানসিক দাসত্ব ত্যাগ না করলে রাজনৈতিক দাসত্ব নেমে আসবে।

যুক্তির মানদণ্ডে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism on the Basis of Reason)

  • পূর্ণাঙ্গ ধর্মের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের লড়াই চিরন্তন।

  • নবী ও রাসূলগণ যখনই পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান কায়েম করতে চেয়েছেন, তখনই বিরোধিতা এসেছে।

  • ইব্রাহিম (আ.)-এর সময়ে নমরুদ ও মুসা (আ.)-এর সময়ে ফেরাউন ধর্মের বিরোধিতা করেছে।

  • আধুনিক পরিভাষায় তারাও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ছিল।

যুক্তি ও বিবেকের দৃষ্টিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism in the Light of Logic and Conscience)

  • ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা যুক্তি দিয়ে তাদের মতবাদ প্রমাণ করতে পারেনি।

  • তারা সর্বদা অন্ধ শক্তির আশ্রয় নিয়েছে।

  • বিশ্বের স্রষ্টা থাকলে মানুষের জীবনে তাকে কার্যকর শক্তি হিসেবে মানতে আপত্তি কেন?

  • আল্লাহ যদি মানুষের জন্য বিধান না দিয়ে থাকেন, তবে তাঁর পূজা করার প্রয়োজন কী?

  • যিনি বিশ্ব পরিচালনা করছেন, জ্ঞানের দিক দিয়ে তাঁর ত্রুটি থাকা সম্ভব নয়।

  • আল্লাহকে স্বীকার করলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আইনদাতা হিসেবে মানতে হবে।

  • ব্যক্তি জীবনে ধর্ম মানা এবং সমাজকে ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার ধারণা দুরভিসন্ধিমূলক।

  • ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের মধ্যে ব্যবধান টানা অবৈজ্ঞানিক।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পরিণাম (Consequences of Secularism)

  • এটি কোন ইতিবাচক মতাদর্শ নয়, বরং নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

  • এটি মানুষকে আদর্শহীন অবস্থায় নিক্ষেপ করে।

আদর্শিক পরিণাম (Ideological Consequences)
  • মানুষকে আদর্শহীন করে অনিশ্চিত পথে ছেড়ে দিলে জীবনে শূন্যতা সৃষ্টি হয়।

  • রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে আদর্শের সন্ধান করতে বাধ্য হয়।

  • বিভিন্ন চিন্তাশীল মানুষ বিভিন্ন আদর্শ আবিষ্কার করে।

  • জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য বিভিন্ন মানুষের রচিত আদর্শ গ্রহণ করতে হয়।

  • ফলে সামঞ্জস্যময় জীবন সম্ভব হয় না।

নৈতিক পরিণাম (Moral Consequences)
  • নৈতিক মূল্যবোধ মানুষকে উন্নত মর্যাদার অধিকারী করেছে।

  • স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও আখিরাতের বিচার মানুষকে নৈতিক করে তোলে।

  • ধর্ম মানুষের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির উপর শক্তি প্রয়োগ করতে পারে।

  • নৈতিক চরিত্র বর্জিত মানুষ পশুর চেয়েও খারাপ হতে পারে।

  • ধর্মবোধ মনুষ্যত্ব জাগ্রত করার একমাত্র অবলম্বন।

মূল্যমানের পরিণাম (Consequences on Values)
  • মূল্যবোধ জীবনকে সত্য ও কৃষ্টিসম্মত করে।

  • স্রষ্টার পক্ষেই চিরন্তন মূল্যমান নির্ধারণ করা সম্ভব।

  • মানুষ নিজের বুদ্ধিতে ভুল মূল্যমান নির্ধারণ করতে পারে।

  • ধর্মকে ত্যাগ করলে চিরন্তন মূল্যমান পাওয়া যায় না।

  • প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়ে মানুষ স্বার্থপর হয়ে ওঠে।

ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের পরিণাম (Consequences of Secular Rule)
  • শাসকগণ আল্লাহর দাসত্ব থেকে মুক্ত হলে সুবিধাবাদী হয়।

  • তারা নিজেদের স্বার্থে শাসনযন্ত্র ব্যবহার করে।

  • তাদের চরিত্র নির্ভরযোগ্য হয় না।

  • আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থাকলে শাসনে বিরাট পার্থক্য দেখা যায়।

  • ধর্মনিরপেক্ষ শাসকরা জনমতকে কলুষিত করে অন্যায়কে ন্যায় বানাতে পারে।

ধর্মীয় পরিণাম (Religious Consequences)
  • ধর্মীয় উপাসনালয়ে বন্দী সত্তার প্রতি মানুষের অবহেলা বাড়ে।

  • বাস্তব সমাধান না দেখালে শুধু পরকালের ভয় দেখালে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

  • তখন মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করতে শুরু করে।

  • এতে নাস্তিকতার দিকে মানুষ ধাবিত হয়।

ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Islam vs. Secularism)

  • ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের খোদা মানুষের স্বার্থের সৃষ্টি।

  • ইসলামের আল্লাহ্‌ মানুষের কাছে পূজা চান না।

  • তিনি একই সাথে স্রষ্টা, পালনকর্তা ও বিধানদাতা।

  • ইসলামে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রের জন্য বিধান রয়েছে।

  • কুরআন সর্বকালে পথ দেখাতে সক্ষম।

  • ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদে রূপান্তর করা অসম্ভব।

  • ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পথে এক বড় বাধা।

মুসলমান ও ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ (Muslims and Secularism)

  • ইসলামে বিশ্বাসী মানুষের ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া স্বাভাবিক নয়।

  • ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান কথাটি কৌতুকপ্রদ।

  • কুরআন ও রাসূলের জীবন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কোন দলিল নেই।

  • যারা মুসলমান থাকতে চায়, তাদের উচিত ইসলামী জীবন অনুসরণ করা।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের প্রকারভেদ (Types of Secularists)

  • ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদেরকে দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: ধূর্ত ও বেওকুফ।

  • ধূর্তরা ধর্মকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে মুখে স্বীকৃতি দেয়।

  • বেওকুফরা নামাজ, রোজা পালন করে কিন্তু ইসলামী বিধান পালনে আগ্রহী নয়।

  • যারা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস করে আর কিছু অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা ও ভয়ংকর শাস্তি।