HSC Bangla: Lalsalu and Batch Information Notes

মজিদ: উপন্যাস ‘লালসালু’-র কেন্দ্রীয় চরিত্র

মজিদ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে একাধারে ধর্মব্যবসায়ী, ভন্ড, স্বার্থপর এবং কড়া মেজাজের অধিকারী। তার দেহের গঠন অত্যন্ত শীর্ণকায় এবং সে একজন বেঁটেখাটো মানুষ। তার মুখে দাড়ি রয়েছে যা অনেকটা ‘গো-গাছি’ (অল্প ও পাতলা) ধরনের এবং তার চোখ দুটি ছিল নিমীলিত অর্থাৎ অর্ধেক বোজা। মজিদের পা দুটি ছিল হাড়সম্বল এবং কঠিন, এবং তার গায়ের চামড়া ছিল শীতের দিনের শুষ্ক তালের চামড়ার মতো।

তিনি হোয়াক্কা (হুঁকো) খাওয়া তার অন্যতম অভ্যাস, এবং তিনি মানুষকে ‘মিঞা’ সম্বোধন করে কথা বলেন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দেন।

মজিদের রহিমার প্রতি আচরণ প্রসঙ্গেও কথা বলা যায়। যখন রহিমা উঠানে দাঁড়িয়ে থাকে, মজিদ তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। মজিদ মাঝে মাঝে অনুভব করে যে রহিমার ওপর তার একটা হঙ্কার ছাড়া উচিত, কিন্তু তা সে সবসময় করে ওঠে না। ধানক্ষেতে লোকেদের নিষ্ঠা দেখে তার মনে মূর্তিপূজারীদের (বুত-পূজারী) মতো ভক্তিভাব জাগ্রত হয়, তবে তার মনে দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। আওয়ালপুরের পিরের সংবাদ পেয়ে মজিদ তার ক্যানভাসার জুতো পরে বগলে ছাতা নিয়ে মতিগঞ্জে রওনা হয়েছিল।

মজিদের চোখ ঝড়ের দিনে উড়ে চলা ‘ক্ষুদ্র পতঙ্গ’-এর মতো, তাকে ‘অন্ধ সাপ’-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং তার প্রভাবকে ‘কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের’ সাথে তুলনা করা হয়েছে। তার কোরআন তেলাওয়াত ‘হাসনাহেনার মিষ্টি ঘ্রাণ’-এর মতো। মজিদের নীরবতাকে ‘পাথর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার দাঁড়িয়ে থাকাকে ‘বজ্রাহত মানুষের’ মতো দেখা যায়।

রহিমা: মজিদের প্রথম স্ত্রী

রহিমা মহব্বৎপুর গ্রামের মেয়ে। সে মজিদের প্রথম স্ত্রী। রহিমা অত্যন্ত ধর্মভীরু, মাজার ভক্ত, স্বামীভক্ত, স্বল্পভাষী এবং পরিশ্রমী। সে মনে মনে গুনাহ বা খোদাকে ভয় পায়। রহিমা লম্বা-চওড়া এবং শারীরিক শক্তির অধিকারী। তার অতীত ইতিহাস উল্লেখ হলে বলা যায়, মজিদের সাথে বিয়ের আগে রহিমা ছিল ‘বেওয়া’ (বিধবা) নারী।

সে স্বামীর একান্ত অনুগত এবং স্বামীর সামাজিক গৌরবে গর্বিত, তার কাছে স্বামীর আদেশ ও আনুগত্যই সর্বশ্রেষ্ট। মজিদ মনে করে রহিমার বিশ্বাস পাহাড়ের মতো অটল এবং তার আনুগত্য ধ্রুবতারার মতো অনড়। রহিমার উজ্জ্বল চোখে যখন ভয়ের ছায়া ঘনিয়ে আসে, মজিদ তখন খুশি হয়। মজিদের দ্বিতীয় বিয়েতে রহিমা কোনো প্রতিবাদ করেনি, এর কারণ তার অগাধ স্বামীভক্তি এবং উর্বর মস্তিষ্কের ধর্মনিষ্ঠা।

রহিমা এবং আমেনা বিবি—উভয়ই নিঃসন্তান। এই মিল থাকা সত্ত্বেও তাদের হৃদয়ের গভীর কোণে এক ধরনের সখ্যতা কাজ করে। সতীিন হওয়া সত্ত্বেও রহিমা জমিলাকে সন্তানের দৃষ্টিতে দেখে এবং জমিলাকে সে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করে। জমিলার আগমনে তার মনে ‘শাশুড়ি’ সুলভ ভাব জাগ্রত হয়। রহিমার শাশ্বত মাতৃত্ববোধের কারণেই তাদের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হয়নি।

রহিমা বিশ্বাস করে যে, মানুষের দুঃখ-যাতনায় যখন মৃত কোনো ব্যক্তি (পীর) ঘুম ভেঙে কাঁদে, তাও একটি সত্য। পৌষ মাসের গভীর রাতে রহিমা ও হাসুনির মা ধান সিদ্ধ করে। রহিমার গায়ে সবসময় ভাতের ওপরের ধানের গন্ধ লেগে থাকে, যা বাংলার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত চিত্র।

জমিলা: মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রী

জমিলা মজিদ-এর দ্বিতীয় স্ত্রী। সে বয়সে নিতান্তই কিশোরী এবং গরিব ঘরের মেয়ে। উপন্যাসে জমিলাকে ‘বিড়ালছানা’-র সাথে তুলনা করা হয়েছে। জমিলা অত্যন্ত চঞ্চল এবং প্রতিবাদী। সে মজিদকে তার শ্বশুর মনে করে ভয় পায় না বরং তাকে শ্রদ্ধা বা ভয়ের চোখে দেখে না। উক্ত উপন্যাসে জমিলা ‘নারীধর্মের প্রতিনিধ’ এবং ‘প্রতিবাদের প্রতীক’। তার চোখে মানুষের ভয় তো দূরের কথা, কোনো ঐশ্বরিক ভয়ও নেই। এমনকি তার স্বাধীন সত্তাকে ‘শঙ্খচিল’-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

জমিলার সন্ধ্যায় ঘুমানোর অভ্যাস রয়েছে এবং সে জায়নামাজে সেজদারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে। জিকিরের আওয়াজে সে বিচলিত হয়ে পড়ে এবং জিকিরের অনুষ্ঠান চলাকালীন ঘর থেকে বাইরে চলে যায়। মজিদ তাকে ‘কাজের বেটি’ বলে পরিচয় দেয়।

তার মুখ ‘চাঁদ’-এর সাথে তুলনীয়, এবং জমিলার ছোট মুখটি ‘এক ফালি চাঁদের’ মতো। তার হাত ‘লইট্টা মাছের’ মতো হাড়গোড়হীন এবং তুলতুলে, আর তার চুলকে ‘কচি কোমল লতা’-র সাথে তুলনা করা হয়েছে।

মাজারের ওপর জমিলা হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে পড়ে ছিল, যা তার অবাধ্যতা ও মজিদ নির্মিত ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞার প্রকাশ।

আমেনা বিবি ও খালেক ব্যাপারী

আমেনা বিবি খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রী। তার বয়স বর্তমানে ৩০ বছর এবং ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। ১৩ বছর সংসার করার পর সন্তান কামনায় সে আওয়ালপুরের পিরের ‘পানিপড়া’ খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। খালেক ব্যাপারী গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি মজিদের পরামর্শে তার প্রথম স্ত্রী আমেনা বিবিকে তালাক দেন।

মজিদের কূটকৌশল প্রসঙ্গেও কথা বলা যায়। ধলা মিয়ার মাধ্যমে আওয়ালপুরের পিরের খবর পাওয়াকে মজিদ ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’র উপমা হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৭ বছর বয়সে (বিয়ের পর থেকে ধরা হলে) আমেনা বিবি স্বামী ও সংসার থেকে বিতাড়িত হয়। বিদায়লগ্নে তার জন্মগ্রাম ‘নাবিনগর’-এর মোড়ে থাকা তালগাছটি দেখে তার কান্না পায়।

ভানু বিবি, খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় স্ত্রী, সে প্রতি বছর সন্তান জন্ম দেয় তবে ভানু বিবি একটু বোকা ধরনের এবং ঈর্ষাপরায়ণ।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রসমূহ

ধলা মিয়া ভানু বিবির বড় ভাই। সে দীর্ঘকায় এবং বোকা প্রকৃতির মানুষ। তিনি আওয়ালপুরের পিরের কাছে পানিপড়া আনতে গিয়ে মজিদের কাছে ধরা খেয়ে যান এবং মজিদকে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। দুদু মিঞা সাত ছেলের বাপ; তার মাথায় আধপাকা চুল। তিনি মজিদকে বলেন, ‘আমি গরিব মুমুক্ষু মানুষ’। মজিদ যখন তাকে কলেমা জিজ্ঞেস করে, সে লজ্জায় হাসে।

আক্কাস, গ্রামের শিক্ষিত যুবক, সে গ্রামের ছেলেদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মজিদ তার আধিপত্য রক্ষার জন্য আক্কাসের স্কুল করার প্রচেষ্টায় বাধা দেয়। তাহের ও কাদের, এরা হাসুনির ভাই, তারা তাদের বাবাকে শাসন করার চেষ্টা করে।

ক্ষুদ্র ও পার্শ্বচরিত্রের তালিকা

সলেমানের বাপ, মধু খাঁ, মতলুব খাঁ—ইত্যাদি চরিত্রের মৃত্যু এবং ভাবনাগুলো উপন্যাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপন্যাসে ব্যবহৃত রূপক ও প্রতীকের সারসংক্ষেপ

মজিদের মিথ্যে ধর্মবিশ্বাসের আবক্ষ প্রতীক হলো ‘লালসালু কাপড়’।

মজিদ ও রহিমার অনুভূতির কাঠিন্য এবং নীরবতার প্রতীক হলো ‘পাথর’। মোটামুটি মৃত্যুর ভয় ও চাপের অবস্থাকে প্রকাশ করেছে ‘সাপ’। জমিলার অসহায়ত্ব কিন্তু চঞ্চলতার প্রতীক হল ‘বিড়ালছানা’ এবং তার গতির ও স্বাধীনচেতা মনের প্রতীক ‘শঙ্খচিল’।